ইছাই ঘোষের দেউল – যেখানে ইতিহাস ও লোকগাথা মিলে মিশে একাকার
ইছাই ঘোষ -এর দেউল বা ইছাই ঘোষের মন্দির অবস্থিত পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসা থানার অন্তর্গত গৌরাঙ্গপুরে। এই বিশালাকায় পোড়া ইটের তৈরী মন্দিরটি রেখা দেউল ধরণের মন্দির, অর্থাৎ যে দেউলের ওপরে একটি চূড়া বা শিখর আছে। এই দেউলটির ইতিহাস রহস্যে আবৃত এবং লোককথায় বর্ণিত| তবে গড়ন অন্যান্য বিশেষত্ব দেখে কেউ কেউ এটিকে ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর দেউল বলে মনে করেন। পরবর্তীকালে গোপরাজবংশের কেউ হয়ত ইছাই ঘোষের স্মৃতিরক্ষার্থে এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। তবে এই যুক্তির ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল। এই দেউলটির গায়ে কোন ফলক না থাকায় এটির নির্মাণের কাল নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয় এটির নির্মাণ কাল সপ্তদশ শতাব্দীর পুর্বেই হয়ে থাকবে।
বাংলার মঙ্গলকাব্যগুলির অন্যতম ধর্মমঙ্গলে ইছাই ঘোষ ও লাউসেনের কাহিনী বর্ণিত আছে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র ইছাই ঘোষ ঢেকুরের গোপভূম রাজ্যের স্বাধীন রাজা। তিনি ত্রিষষ্ঠীগড়ের রাজা কর্ণসেনকে পরাস্ত করে বর্ধমানের সিংহভাগ দখল করে নিয়ে স্বাধীন গোপভূমি রাজত্ব গঠন করেন ও নিজেকে গোপভূমির রাজা বলে ঘোষণা করেন। তিনি অজয়নদের তীরে এক মন্দির স্থাপন করেন ও তাঁর আরাধ্যা দেবী শ্যামারূপাকে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে, কর্ণ সেনের পুত্র লাউসেন, ইছাই ঘোষ কে যুদ্ধে পরাজিত করে হত্যা করেন।
ধর্মমঙ্গলের ঐতিহাসিক ভিত্তি
এই ঘটনার ঐতিহাসিক ভিত্তি খুজতে গেলে প্রথমেই মনে আসে ঢেক্করী বা ঢেকুর নামটা কোথা থেকে এল। বহুপুর্বে বীরভুম ও বর্ধমান সীমান্তে “ঢেকারু” (মতান্তরে ঢোকরা) নামক এক জাতি ছিল যারা লোহার অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণে পারদর্শী ছিল। এই লোহার ঢেকারু জাতির বসবাসের প্রাধান্যের জন্যই মনে হয় এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল ঢেক্করী বা ঢেকুর। আবার অন্যমতে, এখানে দেবী শ্যামারূপাকে তন্ত্রমতে পূজা করা হতো। এই পুজার শেষে অনেক মোষ ও ছাগল বলি দেওয়ার ফলে এখানে রক্তের ঢেউ বয়ে যেত। এই কারণে এখানকার নাম হয় ঢেউগড় বা ঢেকুর।

১৮৩৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার রানীশংকৈল থানার অধীনস্থ রামগঞ্জ গ্রামে রাঢ়েশ্বর ঈশ্বর ঘোষের এক তাম্রশাসন পাওয়া যায়। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় কুমার মৈত্র বাংলা ১৩২০ সনে (ইংরাজির ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে) সাহিত্য নামের এক পত্রিকায় এই তাম্রশাসনটির বঙ্গানুবাদ সহ একটি বিবরণ প্রকাশ করেন। এই তাম্রপত্রে কোনো সাল তারিখ খোদিত নেই। কেবল সেখানে খোদিত আছে, ‘মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষের ৩৫ তম রাজ্যাঙ্কে মার্গশীর্ষ মাসের প্রথম তারিখে তাম্রশাসনখানি সম্পাদিত হইয়াছিল’। তৎকালীন ঐতিহাসিকরা লিপিবিজ্ঞান, অক্ষরছন্দ এবং খোদাইয়ের রীতি ইত্যাদি বিচার করে এটি পালযুগের শেষ পর্বের বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ কাব্যে ঢেকুরি নামক স্থানের নাম আছে যার শাসকের নাম ছিল ঈশ্বর ঘোষ। এই হিসাবে ঈশ্বর ঘোষ ও ইছাই ঘোষ একই ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। এই ঈশ্বর ঘোষ একাদশ শতাব্দীর পালরাজা, মহীপালের সমসাময়িক। মহীপালের পুত্র নয়পালের শাসনকালে চোল ও কলচুরিদের আক্রমণে পাল সাম্রাজ্যে ভাঙন দেখা দেয়। বহু স্থানীয় শাসক পাল সাম্রাজ্যের শাসন থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেন। মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ বা ইছাই ঘোষ নিজেকে একজন স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেন এবং বর্ধমানের গোপভূমির বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে ঢেকুরে রাজধানী স্থাপন করেন। ইছাই ঘোষ গৌড়ে (তখন পাল শাসনাধীন বাংলার রাজধানী) কোন ধরণের খাজনা পাঠাতে অস্বীকার করেন।
ইছাই ঘোষের বিদ্রোহ দমন করার জন্য গৌড়েশ্বরের আত্মীয় বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নাগড়ের অধিপতি কর্ণসেন ঢেকুর আক্রমণ করেন। যুদ্ধে কর্ণসেন পরাজিত হন। কর্ণসেনের পুত্র লাউসেন বা লাবুসেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইছাই ঘোষকে আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে ইছাই ঘোষ পরাজিত ও নিহত হন। লাউসেনের সেনাপতি ডোমবীর কালুও এই যুদ্ধে নিহত হন। অজয় নদের উত্তর তীরে ‘লাউসেনতলা’ নামে এক গ্রাম আছে। স্থানীয় প্রবাদ লাউসেন এই গ্রামেই তাঁর সৈন্য শিবির স্থাপন করেছিলেন। এখনো ডোম জাতির মানুষেরা বহু দূর দূর অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ১৩ই বৈশাখ তারিখে এসে তাঁদের স্বজাতি কালুবীরের পুজো করেন।
ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল সেই জায়গা অজয়ের দক্ষিণ তীরে, যার বর্তমান নাম ‘কাঁদুনে ডাঙা’। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, লাউসেনের সঙ্গে যুদ্ধের আগে ইছাই ঘোষের আরাধ্যা দেবী শ্যামারূপা বা ভগবতী ইছাই ঘোষকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করেন। ধর্মমঙ্গলে এই ঘটনার উল্লেখ আছে –
শনিবার সপ্তমী সামনে বারবেলা। আজি রণে যাইওনা ইছাই গোয়ালা।।
স্থানীয় লোককথা অনুসারে ইছাই ঘোষের মৃত্যুর পরে, অনেক দিন ধরে নাকি মন্দির থেকে দেবী ভগবতীর কান্নার শব্দ পাওয়া গিয়েছিল।
বর্ধমান বিশেষজ্ঞ ডঃ সুজিত বিশ্বাসের বর্ণনা অনুসারে ছোট ছোট পাতলা ইটের তৈরী এই মন্দির বা দেউলের উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুটের মত। মন্দির চত্বরটি প্রশস্ত ও সমতল। দেউলের সম্মুখভাগে দুটি স্তম্ভ আছে। বর্গাকারের এই দেউলটি ক্রমহ্রাসমান হতে হতে গম্বুজাকৃতি চূড়ায় মিশে গেছে। এর গায়ে টেরাকোটার বড় বড় দেব দেবীর মূর্তি ও অলংকরণ শোভা পাচ্ছে। দেউলের সম্মুখভাগে একটি গণেশের টেরাকোটার মূর্তি এবং তার উপরে একটি পদ্মের টেরাকোটা রয়েছে। এর উপরে টেরাকোটার পার্বতী ও একটি সিংহমুখ বর্তমান । দেউলের পিছনদিকে সম উচ্চস্থানে রয়েছে সরস্বতী, নারায়ণ ও সিংহমুর্তি। দক্ষিণ ও উত্তরদিকেও টেরাকোটার দেবীমুর্তি(সম্ভবত এই মূর্তিটি পার্বতী দেবীর), ফুল, সিংহ, সরস্বতী ও পদ্মফুল আছে। মন্দিরের ভিতরে একটি কুলঙ্গী আছে, সম্ভবত এখানে মন্দিরের প্রাচীন মূর্তিটি তুলে রাখা হত। পরবর্তীকালে কোন একসময়ে মূল্যবান মূর্তিটি চুরি হয়ে গেছে। বর্তমানে গর্ভ গৃহের মধ্যস্থলে একটি শিবলিঙ্গ মূর্তি থাকলেও এটি যে অর্বাচীন কালের তাতে সন্দেহ নেই।

ইছাই ঘোষের গৌরাঙ্গপুরের দেউল থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরবর্তী জঙ্গলের মধ্যে প্রাচীন গড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই জঙ্গলটি একদিকে দলমা পাহাড় অন্যদিকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানেই শ্যামারূপার মন্দির অবস্থিত। মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্যামারূপা দুর্গার আরেক রূপ, ইছাই ঘোষ ছিলেন তাঁর উপাসক। শ্যামারূপার মূর্তিটি অষ্টভূজা দুর্গার মূর্তি। মন্দিরের আসল মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকের বিশ্বাস প্রাচীন শ্যামারূপার মূর্তিটি রাজা মানসিংহ বঙ্গদেশ অভিযানের সময় সঙ্গে করে নিয়ে চলে যান এবং তাঁর রাজধানী বর্তমানে রাজপুতানার অন্তর্গত জয়পুরে স্থাপন করেন। বর্তমান মূর্তিটি কোনো এক সাধক বেনারস থেকে এনেছিলেন বলে জনশ্রুতি।
তথ্যসূত্রঃ
১। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি – প্রথম খন্ড – বিনয় ঘোষ
২। ইছাই ঘোষের দেউল ও শ্যামারূপার মন্দির – ড. সুজিত বিশ্বাস
