চড়ক

চড়ক-গাজনের কথা

চৈত্র সংক্রান্তি হল গাজন উৎসব এর শেষ দিন। গোটা চৈত্র মাস ধরে পালিত হয় এই গাজন উৎসব যার সমাপ্তি হল চড়ক। গ্রাম বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠীর বছর শেষের উৎসব হল ‘গাজন ও চড়ক’। আধুনিক যুগে গাজন উৎসবে কিছুটা তথাকথিত শিক্ষিত উচ্চবর্ণের পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্য করা গেলেও আসলে এটা একটা লোক উৎসব। প্রাথমিক ভাবে এই উৎসব গ্রাম-বাংলার তথাকথিত অন্ত্যজ বর্ণের মানুষজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ইংরেজরা এ দেশে আসার পর তাদের সঙ্গে ব্যবসা করে বা তাদের ব্যবসা সহায়ক হয়ে এক শ্রেণির মানুষ প্রভূত অর্থ উপার্জন করতে থাকেন। সেই সব বিত্তবান শ্রেণির একাংশ বিভিন্ন পালা-পার্বণে জলের মতো টাকা খরচ করতেন। মূলতঃ তাদের উদ্যোগে গাজন-চড়কের মতো প্রান্তিক লোক-উৎসবও মোচ্ছবে রূপান্তরিত হতে থাকে।

হুতোম প্যাঁচার নকশায় হুতোম লিখেছেন,
‘কলিকাতা শহরের চারদিকেই ঢাকের বাজনা শোনা যাচ্চে, চড়কির পিঠ সর সর কচ্চে, কামারেরা বান, দশলকি, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তুত কচ্চে-; সর্বাঙ্গে গয়না, পায়ে নূপুর, মাতায় জড়ির টুপি, কোমরে চন্দ্রহার, সিপাহ পেড়ে ঢাকাই শাড়ি মালকোচা করে পড়া, তারকেশ্বরে ছোবান গামচা হাতে বিল্বপত্র বাঁদা সুতা গলায় যত ছুতোর, গয়লা, গন্ধ বেণে ও কাঁসারির আনন্দের সীমা নাই- ‘আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজন’।’

চড়ক শব্দটা এসেছে চক্র থেকে। অনেক উঁচু একটি শাল গাছের কাণ্ডের আগা থেকে দড়ি দিয়ে বাঁধা গাজন-সন্ন্যাসীদের ঘূর্ণনকে বলা হয় চড়ক। ওই শালকাণ্ডটি আগে নিকটবর্তী কোনও পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হয়। চড়কের আগে সেটাকে তুলে, মাটিতে গর্ত খুঁড়ে প্রথমে লম্বা-লম্বি ভাবে পুঁতে দিতে হয়। তার আগায় একটি বংশ-দণ্ড বা লম্বা শক্ত কাঠের লাঠি, আরও একটা কাঠের টুকরো-সহ এমন ভাবে বেঁধে দিতে হয় যাতে ওই বংশদণ্ড বা লাঠিটা বাধাহীন ভাবে ঘুরতে পারে।

গাজন আদতে লোকউৎসব, পরে তা হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে শিবের উৎসবে পরিণত হয়েছে। বৈদিক পুরাণ শাস্ত্র অনুসারে ধর্ম দেবতা বলতে যমকে বোঝালেও ধর্ম ঠাকুর নামে বাংলার এক আদি লৌকিক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। মূলত অন্ত্যজ মানুষজনই ছিল ওই ধর্ম ঠাকুরের উপাসক। কোনও কোনও সমাজ গবেষক বলেছেন, এই পুজোর সঙ্গে পরবর্তীকালে কিছু বৌদ্ধ তন্ত্র-মন্ত্র মিশে যায় এবং আরও কিছু সময় পরে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে শিব বা রুদ্র ওই ধর্ম ঠাকুরের সঙ্গে মিশে যায়। তারই ফলে অন্ত্যজ বর্ণের আরাধ্য দেবতা ধর্মের গাজন পরবর্তীকালে শিবের গাজনে পরিণত হয়।

গাজনের ব্রত প্রধানত পুরুষরাই পালন করেন। যারা ব্রত পালন করেন তাদের গাজন সন্ন্যাসী বলা হয়। চৈত্র মাসের শুরু থেকে গাজন সন্ন্যাসীরা গেরুয়া বসন পরে, হবিষ্যান্ন খেয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করেন। সংক্রান্তির দিন ঐ সন্ন্যাসীদের এক এক করে ওই চড়ক গাছের আগায় রাখা বংশদণ্ডের একপ্রান্তে বাঁধা লম্বা দড়ির সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বংশদণ্ডের অন্য প্রান্ত থেকে ঝোলানো অন্য একটি দড়ি ধরে অন্য সন্ন্যাসীরা তাঁকে ঘোরাতে থাকেন। শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে সন্ন্যাসীরা ঝোলায় রাখা ফলমূল ছুঁড়তে থাকেন দর্শক তথা পুণ্যার্থীদের দিকে। তার সঙ্গে থাকে কাঁটা-ঝাঁপ, আগুন-ঝাঁপের মতো প্রথাও।

চড়ক পুজোর সঙ্গে অন্য একটি ব্যাখ্যাও জড়িয়ে আছে। মহাভারতের একটা উপকাহিনি থেকে পাওয়া যায় যে, দৈত্যরাজ বাণের কন্যা ঊষা স্বপ্নে কৃষ্ণের পৌত্র অনিরূদ্ধকে দেখে তাঁর প্রেমে পড়ে যান। ঊষা তাঁর এক সখি চিত্রলেখাকে দূতী করে দ্বারকায় পাঠালেন অনিরূদ্ধকে নিয়ে আসবার জন্য। নারদের সহায়তায় চিত্রলেখা অনিরূদ্ধকে নিয়েএলেন বাণরাজ্যে। গোপনে বিয়ে হল দু’জনের। খবর পেয়ে দৈত্যরাজ বাণ অনিরূদ্ধকে বন্দী করলেন। ও দিকে, অনিরূদ্ধকে বন্দী করা হয়েছে খবর পেয়ে কৃষ্ণ-বলরাম বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাণগড় আক্রমণ করলেন। উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধহল। বাণরাজ পরাজিত হলেন। অনিরূদ্ধ-ঊষা কৃষ্ণ ও বলরামের সঙ্গে দ্বারকায় যাত্রা করলেন। যুদ্ধে যাদব বাহিনীর অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বাণরাজ মৃত্যু বরণ করার আগে নিজের আরাধ্য দেবতা শিবের কাছে নিজেকে উৎসর্গ করেন আর কৃষ্ণের কাছে বর প্রার্থনা করেন যে, বছরে অন্তত একদিন যেন তাঁর মত অন্ত্যজ বর্ণের মানুষদের উচ্চবর্ণের মানুষরা প্রণাম করে। কৃষ্ণ বাণরাজকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত বর দান করেন। তাই অন্ত্যজ বর্ণের প্রতীকী বংশধর হিসেবে গাজন সন্ন্যাসীরা বছরের শেষ মাসটি কঠোর সংযম পালনের মধ্য দিয়ে এইভাবে ব্রতটি উদযাপন করেন এবং শেষ দিনটি বাণফোঁরা, কাঁটাঝাঁপ, আগুনঝাঁপের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করে নিজেদের শিবের কাছে উৎসর্গ করেন। তবে ওই প্রথা অমানবিক হওয়ার কারণে ব্রিটিশ আমলে নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে ওই সব প্রথা এমন ভাবে পালন করা হয় যাতে শারীরিক কোনও ক্ষতি না হয়।

এই প্রসঙ্গে বাণগড় অঞ্চল প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বাণগড় জায়গাটা ইতিহাসে কোটিবর্ষ, দেবীকোট প্রভৃতি নামেও চিহ্নিত। মালদা থেকে বালুরঘাটের রাস্তায় গঙ্গারামপুর শহর থেকে ২ কিলোমিটার উত্তরে গিয়ে পুনর্ভবা নদী। ওই নদী পেরিয়ে বাঁ দিকেই বাণগড় ঢিবি।

অবহেলিত প্রত্ন-ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি বাংলার অন্যতম প্রাচীন জনপদ৷ কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামীর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিভাগ ১৯৩৮-১৯৪১ সাধারণ অব্দ পর্যন্ত সময়কালে এই অঞ্চলে খনন কাজ চালায়৷ পরবর্তীকালে, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াও একাধিক বার এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। এখান থেকে আনুমানিক পূর্ব-সাধারণ ৩২৪ অব্দ অর্থাৎ, মৌর্যযুগ থেকে ইসলাম যুগ অবধি সময়কালের প্রত্নবস্তু পাওয়া গিয়েছে।

‘গাজন বা চড়ক’ আসলে একটি লোকসংস্কৃতি। মূল কথা হল, জগৎ-সংসারকে ভোগ করতে হলে ত্যাগের মাধ্যমেই তার রসাস্বাদন করতে হয়। চৈত্র মাসের এই শিব সাধনাকে কেউ বলে শিবের গাজন আবার কেউ বলে নীলের গাজন।

ইতিহাসবিদদের মতে মধ্যযুগের প্রথম দিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে বৌদ্ধরা দলে দলে হিন্দু ধর্মে আশ্রয় নিতে থাকেন। ‘গাজন ও চড়ক’ এদেরই উৎসব। তন্ত্র সাধনার অনুপ্রবেশ ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম ধ্বংসের অন্যতম কারণ। চড়কে নিষ্ঠুর প্রথাগুলির বহুল প্রচলনে এই তন্ত্র সাধনার প্রভাব থাকে। তাদের সন্ন্যাস ব্রতপালন, সারা মাস জুড়ে ভিক্ষা, সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধন—এ সবই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রাত্যহিক কাজ। প্রধানত নদীর ধারের গ্রাম-গঞ্জে, শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে জমে উঠত চড়ক গাজনের মেলা। এক সময়ে চড়ক উপলক্ষ্যে কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় সঙের শোভাযাত্রা বেরোত। বর্তমানে নানা কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

‘গাজন ও চড়ক’-এর ইতিহাস সম্বন্ধে সমাজতত্ত্ববিদরা বলেন, মুলত নিম্ন বর্ণের মানুষজনই গাজনে সন্ন্যাস গ্রহণ করত। উচ্চবর্ণের মানুষেরা তাদের প্রণাম করত। গাজন প্রধানত কৃষক শ্রেণির উৎসব। উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল সূর্য ও পৃথিবীকে ঘিরে। সারা বছর ঘুরতে ঘুরতে সূর্য আলো ও শক্তি শেষ করে আলোকশূন্য হয়ে পড়তে পারে এই ছিল গ্রামবাংলার মানুষের ধারণা। সূর্যের তাপই শস্যের ফলনে সাহায্য করে, বৃষ্টি আনে, পৃথিবী সুফলা হয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে উদ্বিগ্ন কৃষক সমাজ নিজেদের বাঁচার তাগিদে বর্ষার আগমন দ্রুত হোক, এই প্রার্থনা জানাতেই সারা চৈত্র মাস ধরে উৎসবের মধ্যে ‘চড়ক’ পুজো অর্থাৎ সূর্য পুজোর আয়োজন করে। এ সময়ে সূর্যকে দেখা যায় রুদ্ররূপে। এ ক্ষেত্রে শিব, রুদ্র এবং সূর্য এক। অর্থাৎ চড়কপুজো মানে শিবের পুজো। নিম্ন বর্ণের মানুষের কাছে প্রিয় দেবতা শিব। তাই শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করেই এই উৎসবের সূচনা।

Similar Posts

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।