বাংলা ভাষার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাঙলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্যতম সদস্য। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং ভারতের অন্যতম সরকারী ভাষা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মুলতঃ বাংলা ভাষা বহুল ভাবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় ভাষাভাষীদের সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ বাংলা ভাষা ব্যবহার করে।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর প্রাচীন শাখা ছিল দশটি। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে আনুমানিক ২৫০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে মুলভাষা থেকে বিশ্লিষ্ট হয়ে প্রাচীন এই ভাষাগুলির জন্ম হয়েছিল। এই শাখাগুলির মধ্যে ইন্দো-ইরানীয় শাখা-ভাষীরা নিজেদের আর্য্য বলে পরিচয় দিত। এই শাখার দুটি উপশাখা হল ইরানীয় ও ভারতীয় আর্য্য। ভারতীয় আর্য্য (বৈদিক সংস্কৃত) ভাষা গোষ্ঠীর লোকেরা প্রথমে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর বসবাস শুরু করে। এরপর ক্রমশঃ পূর্ব দিকে এগিয়ে পাঞ্জাব, উত্তর ও মধ্য ভারতের স্থানীয় অনার্য্য অধিবাসীদের পরাস্ত করে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিতারিত ও কিছু পরিমান আত্মস্থ করে।
আনুমানিক খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ভারতীয় আর্য্য ভাষার কাঠামোয় পরিবর্তন দেখা দিল এবং মধ্য ভারতীয় আর্য্য ভাষার উদ্ভব হল। ভারতীয় আর্য্য ভাষা তার প্রাচীন সংস্কৃত রূপ ছেড়ে মধ্য স্তর বা প্রাকৃতে পরিণত হল। প্রাকৃতের প্রধান চারটি রূপ হল মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী ও অর্দ্ধমাগধী। এর মধ্যে মাগধীর প্রাচ্য অপভ্রংশ থেকে বাংলা, ওড়িয়া ও অসমীয়া ভাষার উৎপত্তি হয়। অনেকের মতে প্রাকৃতের আর একটি রূপ ছিল যা গৌড়ীয় অপভ্রংশ নামে পরিচিত এবং এই গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি।
বাংলা ভাষা উৎপত্তির সঠিক সময় নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে চর্যাপদগুলিকে বাংলাভাষার আদিম রচনা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এগুলি রচনার আনুমানিক সময় হল খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়। উৎপত্তি থেকে বর্ত্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা বিবর্তনের সময়কে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা
১. প্রাচীন বাংলা যুগ
২. প্রাচীন (আদি) মধ্য বাংলা যুগ
৩. অর্বাচীন (নব্য) মধ্য বাংলা যুগ
৪. আধুনিক বাংলা যুগ
প্রাচীন বাংলা যুগ
আনুমানিক ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা ভাষার প্রাচীন যুগ বা আদি যুগ ধরা হয়। লুই, কাহ্ন, ভুসুকু, শবর, ঢেন্ঢন প্রমুখ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য্যদের রচিত চর্যাপদগুলি বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন রূপে স্বীকৃত। এছাড়াও খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতকে সর্বানন্দ বন্দ্য নামক বাঙ্গালী পন্ডিত রচিত টীকাসর্বস্ব নামক অমরকোষের ব্যাখ্যায় উদ্ধৃত প্রায় তিনশ’ বাংলা শব্দে প্রাচীন বাংলার নিদর্শন পাওয়া যায়। তুর্কীবিজয়ের পূর্ববর্তী যুগের রাজাদের কিছু তাম্রলিপি থেকেও কিছু রাজস্ব পরিমাপ বিষয়ক শব্দ, স্থাননাম ও লোকের নাম পাওয়া যায়।
প্রাচীন (আদি) মধ্য বাংলা যুগ
ত্রয়োদশ শতকের শুরু থেকে বাংলাদেশে তুর্কী আক্রমণ শুরু হয় এবং চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। এই সময়কালকে বাংলা ভাষার ইতিহাসের একটি শূন্যস্থান রূপে গণ্য করা হয়। চতুর্দশ শতকের শেষভাগ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত সময় বাংলা ভাষার ইতিহাসে প্রাচীন মধ্যযুগ হিসাবে স্বীকৃত। এই যুগে বাংলা ভাষা গৌড়ের সুলতান ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হল বড়ু চন্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। এছাড়াও কৃত্তিবাস ওঝা রচিত রামায়ণ, মালাধর বসু রচিত শ্রীকৃষ্ণবিজয়, বিপ্রদাস পিপিলাই মনসামঙ্গল কাব্য ইত্যাদি এযুগের উল্লেখযোগ্য রচনা। এই যুগের শেষদিকে বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
অর্বাচীন (নব্য) মধ্য বাংলা যুগ
বাংলার অর্বাচীন বা নব্য মধ্যযুগের সময়কাল হচ্ছে ষোড়শ শতক থেকে অষ্টাদশ সতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত। এই যুগে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। মৈথিলি কবি বিদ্যাপতির পদের ভাব ও ভাষার অনুকরনে এই যুগে বৈষ্ণব পদাবলির ভাষা তৈরি হয়। এই যুগে বহু শক্তিশালী কবি অজস্র রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকবিতা রচনা করেছেন। এই সময় বাংলা ভাষায় বহু পারসী শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। এছাড়াও এই সময়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতির কুঠি স্থাপনের ফলে বাংলা ভাষায় কিছু কিছু পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসী শদ প্রবেশ করে। এই যুগের শেষ সময়ে পারসী ও হিন্দী-উর্দুর প্রভাবে মুসলমানী বাংলার প্রচলন ঘটে এবং দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের উদ্ভব হয়। বহুল প্রচলিত সত্যনারায়ণের পাঁচালী এই যুগের সৃষ্টি বলে মনে করা হয়।
আধুনিক বাংলা যুগ
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ থেকে বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের সূচনা হয়। এই যুগেই প্রথম বাংলা সাহিত্যে গদ্যের ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে পর্তুগীজ পাদ্রীরা রোমান হরফে বাংলায় গদ্যলেখার প্রচলন করেন। কিন্তু তাদের এই উদ্যোগ সফল হয়নি এবং পরবর্তী কালে এই ধারা বিলুপ্ত হয়। ইংরেজ রাজকর্মচারীদের দেশীয় ভাষায় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়। এই কলেজের ছাত্রদের শিক্ষাদানের জন্য পাঠ্যপুস্তক লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু প্রমুখের প্রচেষ্টায় বাংলায় সাহিত্যে গদ্য রচনার সূত্রপাত হয়। কিন্তু এই গদ্যের ভাষায় সংস্কৃত শব্দের আধিক্য ছিল। পরবর্তী কালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ তুলনামূলক সরল গদ্যে গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে প্যারীচাঁদ মিত্র মাসিক পত্রিকা – য় ধারাবাহিক ভাবে প্রথম বাংলা উপন্যাস আলালের ঘরের দুলাল লেখা শুরু করেন। এই উপন্যাসে প্রথম বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। বিংশ শতকের প্রথমার্ধে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যকে আরও সরলভাবে ব্যবহার করেন যা প্রায় কথ্য ভাষার কাছাকাছি। কালক্রমে বাংলা গদ্যসাহিত্যে সাধু রীতির পরিবর্তে চলিত রীতির প্রচলন হয়।